জন্মশাসনে একেবারে পিছিয়ে

ধর্মীয় অনুশাসন ও গোঁড়ামি, সচ্ছলতা, পর্দাপ্রথাসহ নানা কারণে জন্মশাসনে পিছিয়ে সিলেট৷ এ অঞ্চলে জনসংখ্যা বাড়ার হার দেশের অন্য যেকোন অঞ্চলের চেয়ে বেশি৷ দেশের বেশির ভাগ এলাকায় মহিলাদের প্রজনন হার কমতে থাকলেও এ অঞ্চলে তা বেড়েই চলেছে৷ সিলেটের প্রায় সব এলাকায় পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি বাস্তবায়নে হিমসিম খেতে হচ্ছে কর্মকর্তাদের৷ তার ওপর জনবল সঙ্কট ও কর্মকর্তাদের ভ্রান্ত ধারণার কারণে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম চলছে ধীরগতিতে৷ অনেক মাঠকর্মী পরিবার পরিকল্পনার ব্যাপারে দম্পতিদের উদ্ধুদ্ধ করতে মাঠেই যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে৷

 জনসংখ্যা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে সিলেটে উল্টো প্রবণতার কারণ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু মাত্রাতিরিক্ত কুসংস্কার ও অনুশাসনই নয়, সিলেট বিভাগের ভৌগোলিক ও আর্থ-সামাজিক কিছু বৈশিষ্ট্যও এ জন্য দায়ী৷ দেশে ৯ বছর ধরে সক্ষম মহিলাদের মোট সন্তান ধারণের হার (টোটাল ফাির্টলিটি রেট বা টিএফআর) ৩ দশমিক ৩-এ আটকে ছিল৷ এ সময় সিলেটে টিএফআর ছিল ৪-এর ওপরে৷ ২০০৪ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের (নিপোর্ট) ‘বাংলাদেশ জনমিতিক এবং স্বাস্থ্য জরিপ ২০০৪’-এর ফলাফলে বলা হয়েছে, সারা দেশের টিএফআর ৩-এ নেমে এসেছে৷ অথচ সিলেট বিভাগের জেলাগুলোতে এ সময়ে টিএফআর বেড়েছে৷ ২০০০ সালে নিপোের্টর জরিপে সিলেট বিভাগে টিএফআর ছিল ৪ দশমিক ১৷ সর্বশেষ জরিপে এটি বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ২৷ নিপোের্টর জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের জেলাগুলোয় মাত্র ২৮ দশমিক ১ ভাগ সক্ষম দম্পতি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করে৷ সিলেটে টিএফআর সবচেয়ে বেশি সুনামগঞ্জ জেলায় ৪ দশমিক ৮৩ ভাগ৷ এখনো দেশের ছয়টি বিভাগের মধ্যে সিলেট বিভাগে টিএফআর সবচেয়ে বেশি ৪ দশমিক ১ ভাগ৷ সিলেটের পর রয়েছে চট্টগ্রাম ও এরপর রয়েছে ঢাকা বিভাগের স্থান৷ বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি সিলেট শাখার প্রকল্প কর্মকর্তা মোঃ তাহাজ্জত হোসেন জানান, সিলেটের প্রবাসীদের অসচেতনতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামি ছাড়াও শিক্ষার হার কমে যাওয়া জনসংখ্যা বেড়ে চলার বড় কয়েকটি কারণ৷ পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত এক কর্মী জানান, সিলেটের অনেক মহিলা জন্মনিয়ন্ত্রণে বিশ্বাস করে না৷ এ ধরনের উদাহরণ অনেক৷ জানা গেছে, এখানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জোর তত্পরতা চালানোর ফলে কিছু সক্ষম দম্পতিকে জন্মনিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা গেলেও তাদের বেশির ভাগকে স্থায়ী পদ্ধতি গ্রহণ করানো সম্ভব হয়নি৷ কয়েকজন মাঠকর্মী জানান, সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় গড় সন্তান সংখ্যা ৩ থেকে ৮৷ কারো কারো আরো বেশি৷ গ্রামের অনেক পরিবারে এ সংখ্যা ১৫ ছাড়িয়ে যায়৷ সিলেট পরিবার পরিকল্পনা সমিতির প্রকল্প কর্মকর্তা তাহাজ্জত হোসেন বলেন, তাদের জন্মনিয়ন্ত্রণের যে কোনো একটি পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসতেই অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হচ্ছে৷ জানা গেছে, সামাজিক কুসংস্কার ও নানা ধরনের অন্ধ বিশ্বাসের কারণে সিলেটের চার জেলার পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে আছে৷ জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, কয়েক দিন আগেও শহরের সোবহানীঘাটে পরিবার পরিকল্পনায় উত্সাহ সৃষ্টির লক্ষ্যে তৈরি করা একটি বিলবোর্ড স্থাপন করতে গিয়ে প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাদের৷ শেষ পর্যন্ত বিলবোের্ড ব্যবহৃত বাবা-মা এবং তাদের দুই সন্তানের ছবি বাদ দেয়া হলে তা স্থাপন করতে দেয় স্থানীয় লোকজন৷ অনেক সময় নগরীর বিভিন্ন স্থানে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি বিলবোর্ডগুলো লোকজন সরিয়ে ফেলে৷ পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের সিলেট বিভাগের পরিচালক মোঃ শামসুল হক বলেন, সিলেট অঞ্চলের মানুষের মানসিকতার বিশেষ করে পুরুষদের পশ্চাত্পদ মানসিকতা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বিঘ্ন তৈরি করছে৷ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি সিলেট শাখার প্রকল্প কর্মকর্তা মোঃ তাহাজ্জত হোসেন জানান, সম্প্রতি এক গ্রামে এক রিকশা চালককে জন্মনিয়ন্ত্রণের স্থায়ী পদ্ধতি ভ্যাসেকটমি করানোয় গ্রামের মানুষ প্রচারণা চালায় সে ‘খাসি’ হয়েছে৷ ফলে তাকে ভাতের বদলে কাঁঠাল পাতা খেতে হবে৷ সিলেট নগরীর একটি মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা মঈন আহমেদ স্বীকার করেন, এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে এক ধরনের ভ্রান্ত ধারণা কাজ করে৷ তবে তিনি মনে করেন, ইসলামের দৃষ্টিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ নিষিদ্ধ নয়৷ তিনি আরো জানান, প্রায়ই তিনি জুমার নামাজের খুতবায় সমস্যাটি নিয়ে মুসল্লিদের সচেতন করার চেষ্টা করেন৷ সিলেটে শিক্ষার নিম্নহারও জনসংখ্যা কর্মসূচির ব্যর্থতার একটি বড় কারণ৷ এ বিভাগে শিশুমৃত্যুর হারও বেশি৷ এক জরিপে দেখা যায়, সিলেটে প্রতি ১ হাজার জীবিত প্রসবের ক্ষেত্রে ১১০ জন শিশু মারা যায়৷ তাছাড়া এ এলাকায় দক্ষ ধাত্রী সেবার হার খুব কম৷ সিলেট বিভাগে মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ মহিলা সন্তান জন্মদানের সময় দক্ষ ধাত্রীসেবা পেয়ে থাকে৷ নিরাপদ প্রসবের বিষয়টি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলেই নবজাতক ও মাতৃমৃত্যুর হার এখানে বেশি৷ পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা জানান, শিশুমৃত্যুর উচ্চ হার ছাড়াও দেশের অন্যান্য স্থানের মতো ছেলে সন্তানের প্রতি অধিক আগ্রহ আর জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে পুরুষের অনাগ্রহ সিলেট বিভাগে সাফল্য নিয়ে আসছে না৷ এখনকার প্রবাসীদের একটি অংশ আংশিক প্রবাস জীবন যাপন করেন৷ সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তারা আংশিক প্রবাসী জনগোষ্ঠিকে উচ্চ জন্মহারের একটি কারণ বলে চিহ্নিত করেন৷ তাদের মতে, এ অঞ্চলে আংশিক প্রবাসী পরিবারগুলোর আির্থক সচ্ছলতার কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রতি আগ্রহ কম দেখা যায়৷ তা ছাড়া তাদের তালিকাভুক্ত ১৫ শতাংশ দম্পতির কারো স্বামী বা কারো স্ত্রী বৃটেনসহ অন্যান্য দেশে থাকে৷ এসব পরিবারে জন্মনিয়ন্ত্রণের মতো একটি ধারাবাহিক পদ্ধতি গ্রহণের সুযোগ থাকে না৷ এ বিষয়টি উচ্চ জন্মহারের আরেকটি কারণ৷ জানা গেছে, শুধু সিলেট জেলায় পরিবার পরিকল্পনা সেবা দেয়ার ৫০২টি ইউনিটের মধ্যে ১০৯টি ইউনিটে কোনো পরিবার পরিকল্পনা কর্মী নেই৷ গোটা বিভাগে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে ২০টি ক্যাটেগরির সব মিলে ৭৫৮টি পদ খালি পড়ে আছে৷ বছরের পর বছর ধরে শূন্য পরিবার কল্যাণ সহকারীর ২০০ পদ৷ বিভাগের জেলাগুলোর চিত্রও একই৷ ১৯৯৮ সালের পরবর্তী সময়ে তত্কালীন সরকার স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা খাত কর্মসূচি (এইচএসপি) গ্রহণ করে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে তদারকিভিত্তিক পরিবার পরিকল্পনা সেবা না দিয়ে ‘ওয়ান স্টপ সাির্ভস’-এর আদলে গ্রামে গ্রামে কমিউনিটি ক্লিনিক তৈরি করে৷ সামাজিক সংস্কারের কারণে গ্রামের নারীরা ক্লিনিকে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা নিতে অনীহা প্রকাশ করে৷ তাছাড়া থানার নিচের পর্যায়ে একীভূত স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মীদের স্বার্থগত দ্বন্দ্ব কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছিল৷ বর্তমান সরকার আবারও স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগকে আলাদা করেছে এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে৷ এরপরও এলাকায় মাঠকর্মী চোখে পড়ে না৷ সিলেটের ঝেন্তাপুর উপজেলার সেনগ্রামের মিনারা বেগম ১০ সন্তানের মা৷ তিনি জানান, একটি পুত্র সন্তান চাইতে গিয়েই তিনি এখন ১০ সন্তানের মা৷ সদর উপজেলার মিরাপাড়ার খাদিজা বেগম জানান, তার রয়েছে ৭ সন্তান৷ স্বামী সিকান্দর আলীর ইচ্ছা অনুযায়ীই তার এতো সন্তান হয়েছে৷ তিনি বলেন, আমি ভয়ে ‘না’ বলতে পারিনি৷

সূত্রঃ http://jaijaidin.com/view_news.php?News-ID=10344&issue=68&nav_id=11

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: