শিক্ষায় সব বিভাগের নিচে

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক সঙ্কট, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিদেশ যাওয়ার প্রবণতাসহ নানা কারণে সিলেট বিভাগের শিক্ষার হার ও মান দিনে দিনে নিচের দিকে নেমে এখন তা সব বিভাগের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে৷ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেয়া সর্বশেষ তথ্য অনুয়ায়ী, সাক্ষরতার হারের দিক দিয়ে সিলেট বিভাগই এখন সবচেয়ে নিচে৷ এ বিভাগে সাক্ষরতার হার জাতীয় হারের প্রায় ৮ ভাগ কম৷ অথচ এক সময় সিলেটে এ হার ছিল উল্লেখ করার মতো৷ জানা যায়, ১৯৫১ সালে সিলেট বিভাগে এর হার ছিল ২৪ দশমিক ৪৷ ১০ বছরের ব্যবধানে ১৯৬১ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২০ ভাগে৷ ১৯৮১ সালে তা আরো কমে হয় ১৯ দশমিক ৯ ভাগ৷ ১৯৯১ সালে সারা দেশে গড় হারের চেয়ে সিলেট বিভাগে গড় সাক্ষরতার হার ছিল ৮ ভাগ কম৷ ওই বছর দেশে গড় সাক্ষরতার হার ৩৫ থাকলেও সিলেটে ছিল প্রায় ২৭ ভাগ৷ ২০০১ সালের পরিসংখ্যানেও দেশের ছয়টি বিভাগের মধ্যে সিলেট বিভাগে সাক্ষরতার হার ছিল সর্বনিম্ন৷

বর্তমানে সারাদেশে সাক্ষরতার হার বাড়লেও সিলেটে তা ওইভাবে বাড়েনি৷ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর দেয়া তথ্য থেকে জানা যায়, ২০০১ সালে দেশে সাক্ষরতার হার ছিল ৪৭ দশমিক ৩ ভাগ৷ এর মধ্যে বিভাগওয়ারি হার সবচেয়ে বেশি বরিশালে৷ আর সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে৷ বরিশালে এ হার ৫৬ দশমিক ৩, আর সিলেটে মাত্র ৩৯ ভাগ৷ সিলেটের শিক্ষাবিদরা জানান, ১৯৫১ সাল থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত সাক্ষরতার হারের ছকে অন্যান্য এলাকার তুলনায় সিলেটের অবস্থান ছিল সম্মানজনক৷ এর মধ্যে প্রথম দিকে সিলেটে সাক্ষরতার হার কখনো একেবারে নিচে ছিল না৷ কখনো তা ছিল ১১তম আবার কখনো ছিল পঞ্চম স্থানে৷ কিন্তু গত এক দশক ধরে সিলেটের সাক্ষরতার হার ক্রমেই নিচের দিকে নেমে এসেছে৷ এটা সিলেটের শিক্ষা ব্যবস্থার দৈন্যদশারই একটি চিত্র৷ সমাজবিজ্ঞানী, শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষাবিদদের মতে, সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে সৃষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চরম সঙ্কট, স্থায়ী ও প্রকট শিক্ষক সঙ্কট, অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, অভিভাবকদের অসচেতনতা, স্থানীয় লোকজনের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা ও সেই সঙ্গে শ্রমের মূল্য বেশি থাকার কারণেই সিলেটে শিক্ষাক্ষেত্রে এ উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে৷ সাবেক অর্থমন্ত্রী ও লেখক আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, আমি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় হেঁটে দেখেছি সেখানে শিক্ষার হাল কতো খারাপ৷ সিলেটকে আলোকিত করতে হবে৷ শিক্ষার হার ও মান বাড়াতে হবে৷ সিলেটের সন্তান ও লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র শফিকুল হক বলেন, এক সময় সিলেট থেকে যুবকরা লন্ডনে গিয়ে বাবুির্চর কাজ করতো৷ কিন্তু এখন সিলেট থেকে তরুণ-তরুণীরা সেখানে গিয়ে শিক্ষিত হচ্ছে৷ এখন অবস্থা এমন যে অনেকে রেস্টুরেন্টে কাজ না করায় বৃটেনের রেস্টুরেন্ট ব্যবসা কর্মচারী সঙ্কটের মুখে রয়েছে৷ তিনি বলেন, সিলেটের ছেলেমেয়েরা সিলেটে মানসম্মত শিক্ষা পায় না৷ কিন্তু এ সিলেটীরাই লন্ডনে গিয়ে আজ লিড দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে৷ সিলেট প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদফতরের উপ-পরিচালক মোঃ সিরাজুর রহমান বলেন, সিলেটে শিক্ষার হার ও মান কম, এটা ঠিক৷ শিক্ষক সংকট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্কট ছাড়াও বড় কারণ প্রবাসে যাবার প্রবণতা৷ তিনি বলেন এখানকার অনেক শিক্ষক কর্তৃপক্ষকে না জানিয়েই বিদেশ চলে যায়৷ সিলেটের শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবদুল আজিজ বলেন, সিলেটে সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে শিক্ষার হার ও মান বাড়ছে না৷ এখানে অন্য সব অঞ্চলের চেয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনেক কম৷ শিক্ষকও কম৷ স্কুল ও কলেজে গেলেই শোনা যায় শিক্ষক নেই, শিক্ষক নেই৷ জানা গেছে, সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করলেও সিলেট বিভাগে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ই নেই৷ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদফতর সিলেট সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের চার জেলায় প্রায় হাজারখানেক প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন জরুরি হয়ে পড়েছে৷ এছাড়া দেশের অন্য পাঁচটি বিভাগে বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনে অনুমতি দেয়া হলেও সিলেটের ক্ষেত্রে অনুমতি দেয়া বন্ধ রয়েছে৷ জানা যায়, আয়তনের দিক দিয়ে প্রায় সমান হলেও বরিশাল বিভাগে প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৫ হাজার ৮২৯টি৷ কিন্তু সিলেট বিভাগে তা ৫ হাজার ২৩৫টি৷ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যার দিক দিয়েও সিলেট রয়েছে সব বিভাগের একেবারে নিচে৷ সিলেট প্রাথমিক ও গণশিক্ষা দফতরের এক কর্মকর্তা প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে সিলেট বৈষম্যের শিকার উল্লেখ করে বলেন, কুমিল্লা জেলায় যেখানে ১ দশমিক ৯৭ বর্গ কিলোমিটারে একটি বিদ্যালয় রয়েছে সেখানে সিলেটের তিন বর্গ কিলোমিটারে মাত্র একটি বিদ্যালয় রয়েছে৷ তিনি জানান, কাছে কোনো বিদ্যালয় না থাকায় সিলেট সদর উপজেলার ৩৫টি গ্রামের ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে৷ গোটা বিভাগে বিশেষ করে হাওর-বেষ্টিত সুনামগঞ্জ জেলায় এ অবস্থা আরো খারাপ৷ এদিকে সিলেট বিভাগে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও কম এবং তা দেশের সব বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে কম এ বিভাগে৷ ২০০১ সালের পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য থেকে দেখা যায়, বরিশাল বিভাগে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে এক হাজার ৪১৮টি৷ কিন্তু সিলেট বিভাগে তা মাত্র ৬৭১টি৷ অন্য সব বিভাগে সিলেটের চেয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কয়েকগুণ বেশি৷ রাজশাহী বিভাগে তা প্রায় ৯ গুণ৷ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যচিত্র থেকেই দেখা গেছে, সিলেটে কলেজের সংখ্যাও একেবারে কম৷ নিপোের্টর ২০০৪ সালের জরিপ ফলাফলে দেখা যায়, সিলেটে প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের লেখাপড়া সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীর হার দেশের অন্য যে কোনো এলাকার চেয়ে কম৷ এখানে ৪৪ দশমিক ২ শতাংশ শিশু প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করে৷ খুলনা বিভাগে এ হার সবচেয়ে বেশি ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ৷ অন্যদিকে সিলেটে মাধ্যমিক স্তর অতিক্রমকারীর সংখ্যা ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ৷ আর চট্টগ্রাম বিভাগে এ হার ৫৫ দশমিক ৯ শতাংশ৷ সিলেটের ক্ষুদ্র অংশ চা-শ্রমিক৷ প্রতিটি চা-বাগানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকার নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা নেই৷ সারা দেশের বাগানে মাত্র তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে৷ আর বেশ কয়েকটিতে নামমাত্র স্কুল থাকলেও তাতে কোনো শিক্ষার পরিবেশ নেই৷ ছাত্ররা কেউ গেলে কিছু একটা পড়ান, না হয় বাগানের দাফতরিক কাজে চলে যান৷ শ্রমিকরাও তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে উত্সাহী হয় না৷ তারা শিশুদের বেশির ভাগ সময় বাগানের জঙ্গল পরিষ্কারের কাজে, নাহয় লাকড়ি কুড়ানোর কাজে লাগিয়ে দেয়৷ বাগানের কাজ করলে একজন কিশোরকে ২৬ টাকা করে দেয়া হয়৷ লাকড়ি কুড়ালেও ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পাওয়া যায়৷ বাগানগুলোতে বিদ্যালয় গমন উপযোগী শিশুর সংখ্যা কমপক্ষে ১০ হাজার হবে বলে চা-শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন৷ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের উপদেষ্টা মাখন কর্মকার বলেন, আসলে বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করতে সরকার ও বাগান কর্তৃপক্ষ কেউই আন্তরিক নয়৷

সূত্রঃ http://jaijaidin.com/view_news.php?News-ID=10343&issue=68&nav_id=11

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: