কেমন আছেন কাক টেঙ্গুর গ্রামের মানুষ

দশ বছরের শিশু সাবানা৷ স্কুলে যায় না, তার দুইভাই বুলবুল (১২) ও শফিকুল (৭) সঙ্গে মাছ ধরে হাওরে৷ স্কুলে যাওনা কেন জিজ্ঞাসা করলে তারা তিনজনই জানায়, স্কুলে যাওয়া তাদের জন্য নিষেধ৷ কারা নিষেধ করেছে, কেন নিষেধ করেছে? ‘গোলাম মেম্বার আর পানিশ (প্রাণেশ) দফাদার আমাদের স্কুলে যেতে দেয় না৷ স্কুলে গেলে গোলাপ মেম্বারের ছেলেরা আমাদের মেরে তাড়িয়ে দেয়৷ চোরের ছেলেমেয়ে বলে গালিগালাজ করে৷ স্যারেরাও বই দেয় না৷ বললো তারা৷

জানা যায়, তাদের পিতা বেবী ইসলাম এক সময় চুরি করতেন৷ এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে দিন মজুরি করলেও সমাজ থেকে সহজভাবে মেনে নিচ্ছে না৷ কিশোরগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত ইটনা উপজেলার এলংজুরি ইউনিয়নের কাকটেঙ্গুর গ্রামকে স্থানীয় লোকজন ‘চোরের গ্রাম’ হিসেবেই জানে৷ এক সময় এ গ্রামের সবাই চুরি করে জীবিকা নির্বাহ করতো৷ ভোটার লিস্টেও তাদের পেশা হিসেবে ‘চোর’ উল্লেখ রয়েছে৷ তাদের সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে অন্য কোনো গ্রামের লোকজন অংশ নেয় না৷ এমনকি বিয়েশাদীও হয়ে থাকে চোরের সঙ্গে৷ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলার কামারগাও গ্রামের চোরদের সঙ্গে তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক হয়ে থাকে৷ এসব কারণে সবাই এ গ্রামটিকে চোরের গ্রাম বলেই ডাকে৷ এলাকার লোকজন জানান, এক সময় এ গ্রামে ২-৩শ’ পরিবার বাস করতো৷ এখন মাত্র ৭-৭টি পরিবার কোনো রকমে টিকে আছে৷ বাকি লোকজন কোথায় জানতে চাইলে তারা জানান, ২০০৪ সালের অক্টোবরে পুলিশ ও অন্য গ্রামের লোকজন মিলে চোরদের ঘরবাড়ি আগুন লাগিয়ে জ্বালিয়ে দেয় এবং তাদের মালামাল লুট করে নিয়ে যায়৷ সেই থেকে এ গ্রামের লোকজন ভয়ে ও আতঙ্কে যে যেখানে পারে পালিয়ে গেছে৷ চুরি করার অপরাধে এ গ্রাম থেকে বিতাড়িত হয়েছে আবদুর রহিম, সুন্দর আলী, আলাউদ্দিন, নূরুদ্দিনসহ অনেকেই৷ তাদের প্রায় সবাই চুরি ছেড়ে দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে৷ এ গ্রামেরই ছেলে মোবারক খাঁ, দীন ইসলাম, হীরন খাঁ রাজেন্দ্রপুর ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করেন৷ অনেকেই সিলেটের ভোলাগঞ্জ, ঢাকা, চট্টগ্রাসহ বিভিন্ন স্থানে দিনমজুরের কাজ করছেন৷ বছরের এক দুইবার মাটির টানে ফিরে আসেন গ্রামে৷ গ্রামে এলেও তারা দুই একদিনের বেশি থাকতে পারে না বলে জানা যায়৷ গ্রামের লোকদের অভিযোগ, এলাকার গোলাপ মেম্বারও প্রাণেশ দফাদার তাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করেন৷ চাঁদা না দিলে মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি দেয়৷ যারা কোনো রকমে অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেও টিকে আছেন, তারাও প্রতিনিয়ত অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন৷ গ্রামের মৃত ফরিদ মিয়ার স্ত্রী বৃদ্ধা হামিদা খাতুন জানান, চৌকি বা খাট নেই বলে রাতে মাটিতে চাটাই পেতে ঘুমাতে হয়৷ রাতে ঘুমের মধ্যে ইঁদুর এসে কামড়ায়৷ তার পায়ে ইঁদুরের কামড়ের দাগটিও দেখান তিনি৷ হামিদা খাতুনের মতো আরো দুই তিনজনকেও ইঁদুরে কামড়িয়েছে বলে জানা যায়৷ আলতাফের স্ত্রী মোলেহা খাতুন জানান, ৭-৮টি পরিবারের প্রত্যেকের সংসারেই এখন টানাটানি৷ কোনো রকম এক দুই বেলা খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছেন৷ গ্রামের সবাই জানান, এ গ্রামে কোনো টিউবয়েল না থাকায় বাধ্য হয়ে নদীর পানি পান করতে হচ্ছে৷ আগে একটি টিউবওয়েল ছিল, গ্রামে আগুন দেয়ার সময় সেটি তুলে নিয়ে গেছে বিক্ষুব্ধ লোকজন৷ এ গ্রামে ল্যাট্রিনের কোনো ব্যবস্থা নেই৷ সবাই ঝোপের মধ্যে প্রাকৃতিক কাজ সারেন৷ এলংজুরি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাবিবুল হান্নান বলেন, তারা চুরি ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলে টিউবওয়েল ও স্যানিটারি ল্যাট্রিন দেয়া হবে৷ দুই বছর আগে আগুন দিয়ে তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার পর এখন তো তারা চুরি ছেড়ে ভালো পথে এসেছে, এখন দিচ্ছেন না কেন, জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি৷ তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে যেতে না দেয়ার বিষয়টিও তিনি এড়িয়ে যান৷ ইটনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জহুরুল হক বলেন, এ গ্রামের ভূমিহীনদের তালিকা দিতে বলেছি৷ চুরি ছেড়ে ভালো হয়েছে এমন নিশ্চয়তা পেলে তাদের খাস জমি দেয়া হবে৷ খাসজমি বন্দোবস্ত পেতেও প্রভাবশালীরা বাধা দিচ্ছে, গ্রামবাসীর এ অভিযোগের ব্যাপারে ইউএনও বলেন, বিষয়টি আমি দেখবো৷

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: