হারিয়ে যাওয়ার তিনটি বছর

শহিদুল ইসলাম পলাশ লন্ডন থেকে
সম্ভবত খুব অল্প সময়ের জন্য জ্ঞান হারিয়েছিলাম। জ্ঞান ফিরলে চোখ মেলে দেখি কয়েকজন ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলা আমার ওপর ঝুঁকে কিছু বলছে। সম্ভবত আমাকে ডাকছিল। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কথা বলতে চেষ্টা করলাম তাও পারলাম না। উঠে বসার প্রাণপণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম। হাত-পা স্থির। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম মেঝেতে রক্তের বন্যা আর আমি বাঁকা হয়ে Floor -এ শুয়ে আছি। লোকগুলো কিছু একটা যন্ত্রের সাহায্যে আমাকে শূন্য তুলে একটা বেডে শুয়ে দিল এবং ডাকাডাকি অব্যাহত রাখল। কিন্তু  আমি একদণ্ডও বুঝতে পারছিলাম না। এরই মধ্যে একজন আমার মাথা সেভ করতে থাকল এবং শেষে মাথার পেছনের দিকে সেলাই করতে ব্যস- হয়ে পড়ল। অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে শরীরের সব শক্তি দিয়ে চিৎকার করলাম। কিন্তু একটা ক্ষীণ ‘ও’ শব্দ ছাড়া আর কিছুই মুখ থেকে বের হল না। তবে চোখ থেকে ঠিকই জলের ধারা শুরু হয়ে গিয়েছিল। হ্যাঁ, জ্ঞান হারানোর সঙ্গে সঙ্গে আমি আমার বাক ও স্মৃতিশক্তি হারিয়েছি সেদিন। ভুলে গেছি কে আমি। কি আমার নাম, কোথায় আমার বাড়িঘর, কারা আমার মা-বাবা কিংবা ভাইবোন_ সব_ সবকিছু। আর এরই মাধ্যমে সেদিন ১৯ আগস্ট, ২০০৫-এ আমি শুরু করেছিলাম হাবিয়ায় আমার জীবনের নতুন অধ্যায়। যাহোক ঘণ্টা দুয়েক পরে আমার অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে ওরা আমাকে emergency Ward-G Transfer করল। যদিও এরই মধ্যে আমি বুঝতে পারছিলাম আমি কোন এক হাসপাতালে। কিন্তু বাকশক্তি হারিয়ে ফেলায় কাউকে কিছু জিজ্ঞাসা করতেও পারছিলাম না। পরদিন দুপুরে ঘুম ভাঙলে দেখি আমার মুখে অক্সিজেন মাস্ক। শরীরে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি লাগানো, স্যালাইন চলছে। পাশে থাকা এক নার্সকে ইশারায় মাস্ক খুলে দিতে বললে ও তা খুলে দেয়। আমি কথা বলতে সক্ষম হলাম অর্থাৎ প্রায় ২৮ ঘণ্টা পরে আমার বাকশক্তি ফিরে এসেছে। আমি ওকে আমার অবস্থা এবং অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। কিন্তু ও আমার কথা বুঝতে পারল না এবং আমিও ওর কথা কিছুই বুঝলাম না। সেই সময় এই হাসপাতালে বাংলাদেশী এক Patient ছিল। নার্সরা ওকে খবর দিলে ওর সঙ্গেই সর্বপ্রথম কথা বললাম। ও আমাকে গতকালের সব ঘটনা খুলে বলল এভাবে। সকাল ৯টার সময় গোসল করতে যাওয়ার জন্য বিছানা থেকে ঝযড়বিৎ Shower Chair-G Transfer nIqvi mgq Chair-এর পেছনের অংশ ভেঙে যায় এবং আমি Balance হারিয়ে পেছনের দিকে পড়ে যাই এবং পড়ার সময় চেয়ারের পেছনে অবস্থিত লকারের Key hole-এ রক্ষিত চাবিটি আমার মাথার পেছনে ঢুকে যায়। যার ফলে আমার বাকশক্তি ও স্মৃতিশক্তি দুটিই চলে যায়। সঙ্গে হাত দুটির কার্যক্ষমতাও। ওর মাধ্যমেই জানলাম, দীর্ঘ প্রায় ২ বছর যাবৎ আমি এই হাসপাতালে পঙ্গু হয়ে পড়ে আছি। আমার নাম শহিদুল, দেশ বাংলাদেশ, আমি এখন ইংল্যান্ডে ইত্যাদি সবকিছু। এরপর থেকে ওই আমাকে প্রতিদিন একটু একটু করে ইংরেজির তালিম দিয়েছে। দেশের কথা বলেছে। কিন্তু নতুন এই দুঃসহ যন্ত্রণাযুক্ত জীবনের সঙ্গে কোনভাবেই খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না। প্রায় সার্বক্ষণিকই Mental depression -এ ভুগতাম। ডাক্তার, নার্স, সাইক্লোজিস্ট সবাই চেষ্টা করত আমাকে একটু বাড়তি সময় দিতে। এর কয়েকদিন পরে এক physio এসে আমাকে ‘Why Jesus’ নামে একটি চার্ট বই দিয়ে গেল পড়তে। পড়া শেষে ওকে জানালে ও আমাকে Jesus Christ সম্পর্কে অনেক কিছু বলল। আসলে এই মুহূর্তে ধর্ম সম্পর্কে কোন কিছুই আমার সঙ্গে ছিল না। পরের সপ্তায় ও আমাকে একটি ‘Holy Bible’  উপহার দিল। আমি রোজ এটি পড়তাম। একদিন Physio এলে ওকে আমি Bibleটি প্রতিদিন পড়ছি এবং বেশ উপভোগ করছি জানালে ও আমাকে Church-এ নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করল। আমিও বেশ সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম। এ পর্যন্ত- ১১ বার আমি চার্চে গিয়েছি এবং সত্যিকার অর্থেই উপভোগ করেছি। কিন্তু সমস্যা হল অন্য জায়গায়। চার্চের কথা বড় ভাইকে ফোনে জানালে ওরা খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল এবং আমাকে ফোনেই ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত বলত। হাসপাতালে কর্মরত পাকিস্তানিরাও আমাকে Bible পড়তে ও চার্চে যেতে নিষেধ করত। আমি বেশ দ্বন্দ্বে ভুগতে ভুগতে একদিন আমার অস্ট্রিয়ান এক মুসলিম ডাক্তার বন্ধুকে এ বিষয়ে জানালে প্রথম দিন কিছু না বললেও পরের দিন সে আমাকে একটি Arabic to English ‘Holy Quran’ উপহার দিল এবং এর পরের সপ্তায় চারটি বাংলা হাদিসের বইসহ আরও একটি Bengali Version ‘Holy Quran’ দিয়েছিল, আমি অবশ্য নিয়মিতই এগুলো পড়ি। মানসিক শান্তির খোঁজে আমি যখন মহাব্যস্ত- ঠিক তখনই শারীরিক এক মহাশক্তির অস্তিস্ব  অনুভব করতে লাগলাম আমার মাথায়, সেটি হল মাথার পেছনে ডানদিকে ঢেউ খেলানো প্রচণ্ড মাথাব্যথা। সপ্তাহে ২-১ দিন এই ব্যথায় ভুগি। যখন ব্যথা শুরু হয় তখন কথা বলতে পারি না। নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ডাক্তার মাথার স্ক্যানসহ বিভিন্ন Test করার পর বললেন, এটা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পূর্বলক্ষণ হতে পারে। তবে চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া তাদের আর নাকি কিছুই করার নেই। আমার ভাইকে এ বিষয়ে জানালে সে বলল, ১৯৯৬ সালে আমার একবার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছিল এবং এর আগে আমি ঠিক এরকম মাথাব্যথা অনুভব করতাম। আমি যখন মাথাব্যথায় প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছিলাম তখন একদিন হঠাৎই ডাক্তার, নার্স, Discharge Co-ordinator, সাইক্লোজিস্ট আমাকে নিয়ে বৈঠকে বসলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, মুসলিম ধর্মে লাশ দাফনের পদ্ধতি কি? আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলাম, তবে কি আমি মারা যাচ্ছি? জবাব এল Unfortunately এটা সত্য। তাদের কিছুই করার নেই। আমি তাদের অনুরোধ করলাম, মৃত্যুর পরে আমার লাশ দেশে পাঠিয়ে দিতে। ওরা বলল, এমন কোন Procedure NHS এর নেই। স্মৃতিশক্তি নষ্ট হওয়ায় আমি লাশ দাফনের পদ্ধতি না বলতে পারায় ওরাই আমাকে Chaplancy File বের করে দাফনের পদ্ধতি দেখাল এবং সিদ্ধান- হল যদি মারাই যাই তবে Local কবরস্থানেই আমার লাশ দাফন করা হবে। ওই সভায় আরও সিদ্ধান- হল Mental depressions থেকে বাঁচা এবং সময় কাটানোর জন্য আমি এখন থেকে ২৪ ঘণ্টাই Spinal Internet Cafe-i Computer ব্যবহার করতে পারব। যদিও অন্যান্য  Spinal Patient দিনে মাত্র ১ ঘণ্টা ব্যবহার করতে পারে। ডাক্তারের ভাষ্যমতে, এটি এক ধরনের Treatment-I ও বটে। যদি আমি দেশ সম্পর্কে জানি, দেশের খবরাখবর পড়ি, তাহলে হয়তো স্মৃতিশক্তি ফিরেও আসতে পারে। সেই থেকে আমি প্রতিদিন তিনটি বাংলা সংবাদপত্র যথা- যুগান্তর, প্রথম আলো ও ইত্তেফাক পড়ি আর ফান ম্যাগাজিনগুলো যেমন- বিচ্ছু, আলপিন, ছুটির দিনে ইত্যাদি Print করে রুমে এসে পড়ি। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের খবরাখবরই আমার এখন জানা। প্রেসিডেন্ট, সিইসি, কিবরিয়া, আহসানউল্লাহ মাস্টার, আজিমপুর কবরস্থান কিংবা পিন্টু, ১৭ আগস্ট বা জেএমবি, ২১ আগস্ট, কানসার্ট থেকে শনিরআখড়া, সর্বশেষ শামসুর রাহমান কি না জানি। কিন্তু  জানি না বা চিনি না আমার মা-বাবা, ভাইবোন, আত্বীয়-স্বজন কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষীদের। তবুও শিকড়ের সন্ধানে আমাকে আমার দেশে ফিরতে হবে। সম্ভবত খুব শিগগিরই। তবে আমি জানি না কিভাবে আমি বাঁচব? কে আমাকে Look after করবে? ওষুধপত্রের খরচইবা কোত্থেকে আসবে? জানি না কষ্ট আর যন্ত্রণার বোবা আর্তনাদের শেষ কবে হবে? অথচ দেখতে দেখতে হাসপাতালের বিছানাতেই তিন-তিনটি বছর কাটিয়ে দিলাম।

সূত্রঃ http://jugantor.com/online/news.php?id=25092&sys=3

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: