সিলেটে চার গ্রেনেড হামলার দায় স্বীকার করেছে হরকাতুল জিহাদ – আদালতে দুই জঙ্গি বিপুল ও রিপনের স্বীকারোক্তি

সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার দায় স্বীকার করেছে মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ। জঙ্গিরা জাতীয় ও আন-র্জাতিক পর্যায়ে বহুল আলোচিত এ ঘটনা ছাড়াও আরও তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার দায় স্বীকার করে।  ঘটনাগুলো হচ্ছে সিলেটের জনপ্রিয় মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের ওপর দু’দফা ও আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি সৈয়দা জেবুন্নেছা হকের বাসায় গ্রেনেড হামলার ঘটনা। সিলেটের প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আলম সিদ্দিকীর কাছে হরকাতুল জিহাদের দুই গ্রেনেডবাজ সোমবার বিকালে এই স্বীকারোক্তি প্রদান করে। এই দুই জঙ্গি হচ্ছে শাহেদুল আলম বিপুল ও রিপন। এর আগে পরপর চারদফা ১০ দিন করে তাদের রিমান্ডে নেয়ার পরও এই দুই জঙ্গি স্বীকারোক্তি দেয়নি। রোববার সিলেটের আদালতে হাজির করে এদের পঞ্চম দফা রিমান্ডে নেয়া হয়। সিআইডি’র সিনিয়র এএসপি ও মামলার তদন-কারী কর্মকর্তা মুন্সী আতিকুর রহমান ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলার মামলায় দুই জঙ্গিকে রিমান্ডে নেন। তাদের একটি মামলায় রিমান্ডে নেয়া হলেও স্বীকারোক্তিতে কাকতালীয়ভাবে চাঞ্চল্যকর চার গ্রেনেড হামলার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। জঙ্গিরা বলেছে, সব গ্রেনেড হামলার সঙ্গে সিলেটের দুই মাদ্রাসা ছাত্রও জড়িত। এদের নাম ফাহিম ও হিমু। ফাহিমের পুরো নাম ফখরুল ইসলাম ফাহিম। তার বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায়। তার সহযোগী হিমুর বাড়ি সিলেট নগরীর শিবগঞ্জে। তারা হরকাতুল জিহাদের সদস্য। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেনেডবাজ দুই জঙ্গি স্বীকার করেছে, হরকাতুল জিহাদের প্রধান মুফতি হান্নানের নির্দেশেই তারা এ হামলা চালায়। মুফতি হান্নান গ্রেনেড হাতে তুলে দেয়ার সময় বলে দিয়েছিল, এসব বোমা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন করতে ব্যবহূত হবে।
যে কারণে গ্রেনেড হামলা
স্বীকারোক্তিতে জঙ্গিরা বলেছে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন করার জন্য মুফতি হান্নান বলেছিল, একজন মেহমান সিলেটে গেছেন, তাকে দাওয়াত দিতে হবে। জঙ্গিদের ভাষায় দাওয়াত অর্থ হচ্ছে, হামলা চালানো। মৌলবাদী জঙ্গি হরকাতুল জিহাদের বিশ্বাস ব্রিটিশ ও আমেরিকানরা ইসলামের শত্রু, মুসলমানদের শত্রু। আনোয়ার চৌধুরী মুসলিম হলেও ব্রিটিশের প্রতিনিধি। এ কারণেই তাকে খতম করার নির্দেশ আসে। হুকুম অনুযায়ী হামলা চালায় বিপুল ও রিপন। আওয়ামী লীগের ওপর হামলার ব্যাপারে জঙ্গিরা বলেছে, আওয়ামী লীগ নাস্তিক  মুর্তাদের অনুসারী, ইসলাম বিদ্বেষী দল। তারা ভারতের চর। তাছাড়া তারা ক্ষমতায় গিয়ে কওমি মাদ্রাসা বন্ধের অপচেষ্টা চালিয়েছিল। তারা ক্ষমতায় গিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষাবিরোধী অপতৎপরতা চালানোর পাশাপাশি মুফতি আমিনী, শায়খুল হাদিসসহ আলেম-উলামাদের হয়রানি-নির্যাতন করেছে। এ কারণেই আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নেতাদের নিশ্চিহ্ন করতেই মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ এ হামলার ঘটনা ঘটায়। নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
আলোচিত সেই চারটি গ্রেনেড হামলা
২০০৪ সালের ২১ মে ওলিকুল শিরোমণি হযরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহ প্রাঙ্গণে জুমার নামাজ শেষে ফেরার পথে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছোড়া হয়। এ সময় গ্রেনেডে তিনজন মারা গেলেও অল্পের জন্য বেঁচে যান আনোয়ার চৌধুরী। ঘটনাস্থলে নিহত হন নগরীর দরগাহ এলাকার বাসিন্দা রুবেল আহমদ, পুলিশ সদস্য কামাল ও দিনমজুর হবিবুর রহমান হবি। আহত হন বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী, তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবুল হোসেনসহ আরও শতাধিক। এ ঘটনায় বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। রহস্য উদঘাটনে পরপর দু’দফা সিলেটে তদন্ত এসেছে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড পুলিশ। কিন্তু  কেউই এ ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি।
একই বছরের ৭ আগস্ট নগরীর গুলশান সেন্টারে মহানগর আওয়ামী লীগের সভা শেষে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। এ হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পান মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। তবে গ্রেনেড হামলায় নিহত হন মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ইব্রাহিম আলী। আহত হন আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলী, এনাম আহমদ, অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজসহ ৩০/৩৫ জন নেতাকমর্ী। ওই হামলার ব্যাপারে গুলশান সেন্টারের পাহারাদার বেলালের জবানবন্দি থেকে সিআইডি ধারণা পেয়েছিল নিহত ইব্রাহীম হচ্ছেন গ্রেনেড হামলাকারী। এ হামলায় আহত অনেকেই এখনও পঙ্গুত্ববরণ করে বেঁচে আছেন।
একই বছরের ২৪ ডিসেম্বর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী সৈয়দা জেবুন্নেছার তাঁতীপাড়ার বাসায় সভা চলাকালে বোমা হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে জেবুন্নেছা আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান। এছাড়াও মেয়র পত্নী আসমা কামরানসহ ১০ জন ওই হামলায় আহত হন। জেবুন্নেছা দীর্ঘদিন দেশে-বিদেশে চিকিৎসা শেষে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তবে এখনও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। ২০০৫ সালের ২ ডিসেম্বর নগরীর টিলাগড়ে একটি ব্যাডমিন্টন টুর্ণামেন্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। নিক্ষিপ্ত গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত না হওয়ায় ভাগ্যক্রমে অল্পের জন্য বেঁচে যান কামরান।
সূত্রঃ http://jugantor.com/online/news.php?id=28386&sys=1

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: