ছাতকের সাবেক এমপি মিলনের লুটপাট : বাদ যায়নি পাহাড়-হাওর

গত পাঁচ বছরে ছাতকের বিএনপিদলীয় সাবেক সাংসদ কলিম উদ্দিন মিলন সরকারের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থের বেশিরভাগই পকেটস্থ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার লুটপাট থেকে বাদ যায়নি পাহাড় ও হাওর। এলাকার পাহাড়, হাওর লুটপাট, অবৈধ ড্রেজিংয়ের অনুমোদন, টেন্ডার দলীয়করণ, মামলা-মোকদ্দমায় তদবির, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন_ এমন অভিযোগ করেছেন মিলনের দলীয় লোকরাই। মিলন লুটপাটে প্রয়োজনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দলের নেতাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলেন। যার বদৌলতে গত নির্বাচনে তিনি বর্তমান পৌর চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কালামের সার্বিক সহযোগিতা পান। নির্বাচনের পর কালামও হন মিলনের লুটপাটের অন্যতম অংশীদার। তাদের মতে, সিলেট বিভাগের যে ক’জন সাংসদ ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বিএনপি জোট সরকারের আমলে কোটিপতি হয়েছেন তাদের মধ্যে মিলন অন্যতম। ২০০১ সালের নির্বাচনে জোটের জোরে এমপি হওয়া মিলন লুটপাট করে হয়েছেন কোটিপতি। একজন তৃতীয় শ্রেণীর ঠিকাদার থেকে ক্ষমতার ছোঁয়ায় তিনি কিভাবে এত টাকার মালিক হলেন এই জিজ্ঞাসা এখন এলাকার লোকজনের মুখে মুখে।
পাহাড় লুটপাট
কলিম উদ্দিন মিলনের বিরুদ্ধে পাহাড় কেটে লুটপাট করার অভিযোগ রয়েছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য থাকাকালে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তিনি এলাকায় বন বিভাগের কয়েকশ’ একর ভূমিতে তাণ্ডব চালিয়েছেন। হাতিয়ে নিয়েছেন প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা। বন বিভাগ থেকে বনায়নের জন্য দু’শ একর ভূমি লিজ নেন। তার লোকজনের মাঝে লিজকৃত ভূমিতে বনায়ন না করে যত্রতত্র মাটি খুঁড়ে পাথর উত্তোলন করান মিলন। গত ৫ বছরে এসব এলাকা থেকে পাথর বিক্রি করে কয়েক কোটি টাকার মালিক হন তিনি। তার পাথরের ক্ষুধা মেটাতে স্থানীয় বাসতলা গ্রামটি এখন হুমকির মুখে। মিলন দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের নাসিমপুর মৌজায় উপকারভোগী প্রকল্পের নামে বন বিভাগের দু’শ একর ভূমি লিজ নেন। লিজকৃত ভূমির পাশে ইসলামপুর ইউনিয়নের হাদার পাহাড়টি ক্ষমতা দেখিয়ে দখল করে নেয়া হয়। ছাতক পৌর বিএনপির সভাপতি সৈয়দ তিতুমীর আহমদ, সাংগঠনিক সমপাদক আবদুর রহমানসহ ১০-১৫ জন দলীয় নেতাকমর্ীর নেতৃত্বে চলে পাহাড় লুটপাট কার্যক্রম। নির্ধারিত হারে কমিশন নিয়ে সাবেক সাংসদ তাদের শেল্টার দিয়েছেন। পরিবেশের ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে পাহাড় কাটতে ও পাথর উত্তোলনের জন্য দেশে প্রচলিত আইনের কোন তোয়াক্কা করেনি বিএনপির লোকজন।
হাওর লুটপাট
চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে গত ৫ বছরে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের দোয়ারাবাজার-ছাতক উপজেলার দুই শতাধিক ছোট-বড় হাওর, বিল-নদী ঘিরে লুটপাট হয়েছে স্থানীয় সাংসদ কলিম উদ্দিন মিলনের নেতৃত্বে। এসব জলাশয় নামমাত্র মূল্যে লিজ নিয়ে কোটি কোটি টাকার মৎস্য নিধন করেন বিএনপির নেতাকমর্ীরা। গত বছর সাবেক সাংসদ মিলনের পছন্দের লোকজনকে এসব হাওর, বিল-নদী লিজ দিতে বাধ্য হয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এক্ষেত্রে ক্ষমতার দাপটে প্রচলিত নিয়ম-কানুনকে তোয়াক্কা করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিএনপির নেতাকমর্ীদের চাহিদা মেটাতে এক্ষেত্রে প্রতি বছর সরকার ৫ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। লিজ গ্রাহকরা নির্বিচারে ছোট-বড় মাছ তুলে বিক্রি করে নিজেদের পকেট ভারি করলেও মাছ সংরক্ষণের জন্য কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। উল্টো মাছ ধরার নামে হাওর, বিল-নদীর পরিবেশকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তেলিখাল, ডেংগারখারা ও বৈশা বিলসহ সব হাওর তাদের ঐতিহ্য হারাচ্ছে।
ভূমি জরিপ থেকে কমিশন আদায়
জোট সরকারের শাসনামলে দোয়ারাবাজার ও ছাতক ভূমি জরিপের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের হাত করে কোটি টাকা কমিশন নিয়েছেন সাবেক সাংসদ কলিম উদ্দিন মিলন। মিলনের শেল্টারে থেকে ভূমি কর্মকর্তা তপন তরফদার ও সত্য বাবু ব্যাপক অনিয়ম চালিয়েছেন জরিপ কাজে। তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী ভূমির মালিকানায় নামজারি করা হয়। তাদের অনিয়ম, দুনর্ীতি ও অব্যবস্থাপনার শিকার হন প্রকৃত ভূমি মালিকরা। নানা অজুহাত দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। মিলনের নেপথ্য সহযোগিতায় এ দুই কর্মকর্তা গত ৫ বছরে কোটিপতি হন। খাস জমি লিজ দেয়ার নামেও চলে নগদ বাণিজ্য। তপন তরফদার দুই তলা ভবন নির্মাণসহ নামে-বেনামে হয়েছেন ব্যাপক ভূমির মালিক। সত্য বাবু সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ২ কেদার ভূমির মালিকসহ প্রচুর সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাদের সব ধ্বংসের ঘুষ বাণিজ্যে যা আয় হয়েছে এর নির্দিষ্ট একটি অংশ মিলন পেয়েছেন বলে তার একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে।
ড্রেজিং বাণিজ্য
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য থাকায় ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে মিলন গত ৫ বছর সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে ড্রেজিংয়ের সুযোগ করে দিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসনে প্রভাব থাকায় সিলেট-সুনামগঞ্জের সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর শতাধিক স্পটে ড্রেজিং করার সুযোগ করে দিয়েছেন নদী ধ্বংসকারীদের। এর মধ্যে সিলেট শহরের সুরমার পূর্ব-পশ্চিম পাশের অর্ধশত স্থানে অবৈধভাবে ড্রেজিং করা হয়। এসব ড্রেজিং সাবেক এমপি মিলনের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করতেন আওয়ামী লীগ নেতা আফতাব। এই পরিবেশ ধ্বংসের মহোৎসবের খেসারত দিতে হয় শত শত নদীতীরবতর্ী পরিবারকে। এমনকি বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা, হাটবাজারও এখন হুমকির মুখে পড়েছে। বিভিন্ন সময় ক্ষতিগ্রস-ের শিকার লোকজন সংবাদ সম্মেলন করে সুরমা নদীতে ড্রেজিং বন্ধ করার দাবি জানালেও প্রশাসন আমলে নেয়নি।
টেন্ডার দলীয়করণের ৫ বছর
গত ৫ বছর ছাতক-দোয়ারাবাজারের সব টেন্ডার পেয়েছেন বিএনপির নেতাকমর্ীরা। দলীয় সাংসদ কলিম উদ্দিন মিলনের নেতৃত্বে দলীয় নেতাকমর্ীরা প্রভাব কাটিয়ে সব কাজ নিয়ে যায়। দুই উপজেলায় ৫ বছরে কয়েকশ’ কোটি টাকার কাজ হয়েছে নামমাত্র। প্রচলিত নীতিমালা অনুসরণ না করে নগ্ন দলীয়করণের মাধ্যমে নূ্যনতম কাজ সম্পন্ন করে বিএনপি নেতাকমর্ীরা লুটপাট করেন সরকারের কয়েকশ’ কোটি টাকা। মিলনের শেল্টারে এসব টেন্ডার হাতিয়ে নেন বিএনপি নেতা বাংলাবাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সোবহান, পান্ডারবাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ, যুবদল নেতা ফারুক ও ছাত্রদল নেতা হারুন। ২ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় নির্মাণাধীন তমিজের ব্রিজের কাজ পায় মিলনের পছন্দের ঠিকাদার। অন্যের নামে কাজ নিলেও নেপথ্যে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন মিলন। সরকার প্রদত্ত টিআরসহ বিভিন্ন প্রকল্পের লাখ লাখ টাকার বরাদ্দকৃত চাল, গম ও নগদ টাকার কাজ পান মিলনের ভাতিজা তানিমুল ইসলামসহ ছাত্রদলের নেতাকমর্ীরা। বিভিন্ন রাস-াঘাট অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ হাতিয়ে সরকারি অর্থের শ্রাদ্ধ করেছেন ছাত্রদল নেতা মেহেদী হাসান, সোনা মিয়া ও মঈনুল ইসলাম। তাদের দাপটে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গত ৫ বছর ছিলেন আতংকে। ছাতক পৌরসভার টেন্ডারও ছিল মিলন বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। পৌর চেয়ারম্যান আবুল কালামের সঙ্গে অাঁতাত করেই গত কয়েক বছর ভাগবাটোয়ারা হয়েছে পৌরসভার টেন্ডার। বিনা টেন্ডারে তারা সমঝোতার মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি টাকার কাজ।
বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণ
গত ৫ বছরে সাবেক সাংসদ কলিম উদ্দিন মিলন ছাতক ও দোয়ারাবাজারে দুই বিদেশী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নগদ টাকাসহ বিভিন্নভাবে তিনি এ সুবিধা পান। এর মধ্যে ছাতকে প্রতিষ্ঠিত লাফার্জ সিমেন্টের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ, কোম্পানিতে লোক নিয়োগ বাণিজ্যে আর্থিকভাবে ফায়দা লোটেন তিনি। দোয়ারাবাজারে টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ড থেকে গ্যাস উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান নাইকোর কাছ থেকে নিয়েছেন বড় অংকের টাকা। গ্যাস উত্তোলনের জন্য আনুষঙ্গিক বিভিন্ন কাজ করে মিলন কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। টেংরাটিলায় একাধিকবার অগি্নকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস- সাধারণ মানুষের পাশে না দাঁড়িয়ে এসব লোকজনকে দেখিয়ে আর্থিক ফায়দা লুটেছেন মিলন। স্থানীয় জনগণের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে মিলন নাইকোর স্বার্থ রক্ষার ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ায় এলাকায় নানা রহস্যের জন্ম দিয়েছে। এলাকায় জোর গুজব রয়েছে নাইকো মিলনকে ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট উপহার দিয়েছে।
অন্যান্য ক্ষেত্রে ফায়দা হাসিল
লুটপাট ও বিদেশীদের কাছ থেকে বড় অংকের আর্থিক ফায়দা হাসিল করেও পেট ভরেনি মিলনের। বিভিন্ন মামলায় সরাসরি হস-ক্ষেপ ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও বাণিজ্য করেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, দোলারবাজার ইউনিয়নের পালপুরের রেনু বিবি হত্যা মামলার প্রধান আসামি নূর মিয়াকে রক্ষা করতে ২০ লাখ টাকা নেন মিলন। যার কারণে আলোচিত এই হত্যা মামলাটি ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। গোবিন্দগঞ্জ আবদুল হক স্মৃতি কলেজের অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলামের মৃতু্যতে নতুন অধ্যক্ষ নিয়োগ দিতে তিনি দুনর্ীতির আশ্রয় নেন। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হওয়ার সুবাদে কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগদানের কথা বলে জনৈক ব্যক্তির কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা নেয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সূত্রঃ http://jugantor.com/online/news.php?id=43594&sys=1

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: