মৌলভীবাজারের নোমান ৫ বছরে কোটিপতি

সাইফুর পুত্র মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক সাংসদ এম নাসের রহমানের ঘনিষ্ঠ খলিফা নোমান ৫ বছরে কোটিপতি বনে গেছেন। তার পুরো নাম নুরুল আলম নোমান। প্রতিবেশীরা তাকে ডাকেন ‘শিয়াইল্যা নোমান’, আর কেউ ডাকেন ‘বাট্টি নোমান’, আবার কেউ ডাকেন ফেন্সি সম্রাট। জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বর্তমানে যুবদলের কার্যকরী কমিটির সদস্য নুরুল আলম নোমান জোট সরকারের আমলে ৫ বছর সাইফুর পুত্র নাসের রহমানের বিস্বস- খলিফা হিসেবে রাজনীতির পাশাপাশি ঠিকাদারি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করায় মুকুটহীন সম্রাট হয়ে অঢেল টাকা কামিয়েছেন। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে নোমানের জীবনধারা। রাতারাতি কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, বাড়ি-গাড়ির মালিক বনে গিয়ে বিলাসবহুল জীবনে পেঁৗছে যায় নোমান পরিবার। এর পেছনে ছিল মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি, বর্তমানে কারাবন্দি সাবেক সাংসদ এম নাসের রহমান ও মৌলভীবাজার পৌরসভার চেয়ারম্যান এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোঃ ফয়জুল করিম ময়ূনের আশীর্বাদ। মৌলভীবাজারে ঢাকা ব্যাংকের শাখায় একাউন্ট খুলে ভুয়া পে-অর্ডার কাটতে গিয়ে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি দুপুরে যৌথ বাহিনীর হাতে আটকের পর কারাগারে রয়েছেন নোমান।
নোমানের উত্থান : ৮০’র দশকে নোমান এসএসসি পাস করে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে ভর্তি হন। চটপটে স্বভাবের নোমান তখন বড় নেতাদের পাশে থেকে তাদের ফরমায়েশ শুনে কাছে ভিড়ে যান। এক পর্যায়ে জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের পদটি বাগিয়ে নেন নির্বাচনের মাধ্যমে। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন- ওই পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি জেলা পরিষদের ছোট ছোট কাজের মধ্য দিয়ে ঠিকাদারি শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতার প্রিয়ভাজন হয়ে বেশকিছু কাজ বাগিয়ে নেন। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর নোমান অপ্রতিরোধ্য হয়ে ঠিকাদারির পাশাপাশি তার দুই ভাইকে নিয়ে অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন। তার বখাটে দুই ভাই জাহাঙ্গির ও আলমগীরকে দিয়ে গড়ে তোলেন অপরাধ সিন্ডিকেট। গাড়িচালক আলমগীর ছিনতাই, চাঁদাবাজির পাশাপাশি বড় ভাই নোমানকে টেন্ডারবাজিতে সাহায্য করত। জোট সরকারের বিদায়ের কয়েকদিন আগে হানিফ পরিবহনের গাড়ি থেকে এক ব্যবসায়ীর ৮ লাখ টাকা লুট করে নেয়। তখন নোমানের মধ্যস্থতায় কিছু টাকা ফেরৎ দিলেও থানায় কোন মামলা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। নোমান ৫ বছরে নামে-বেনামে নাসের-ময়ূনের নাম ভাঙিয়ে কতিপয় অসাধু প্রকৌশলী, বিভাগীয় প্রকৌশলী এবং উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর সহায়তায় কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেন। ২০০১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন- তার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মুহিন এন্টারপ্রাইজের নামে ছাড়াও বেনামে স্থানীয় সরকারের ৭ থেকে ৮ কোটি, জেলা পরিষদের প্রায় ৩ কোটি, সড়ক ও জনপথের (সওজ) ৩ কোটি, গণপূর্ত বিভাগের প্রায় ১ কোটি, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের প্রায় দেড় কোটি এবং মৌলভীবাজার পৌরসভার আরও ১ কোটি টাকার কাজ হাতিয়ে নেন। বিভিন্ন বিভাগে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে লুটপাট চালান। তিনি ঠিকাদার সমিতির সাধারণ সম্পাদকের পদে থাকার কারণে কমিশনের ভিত্তিতে সরকারি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন। তার সবচেয়ে বড় নেটওয়ার্ক ছিল জেলা পরিষদ, এলজিইডি, গণপূর্ত বিভাগ ও সওজে। মৌলভীবাজার শহরের সুলতানপুর এলাকায় যে বাড়িতে তারা ভাড়া থাকত সেই ৩ তলা বাড়িটি অর্ধকোটি টাকা দিয়ে নোমান কিনে নেন বাড়ি মালিক সৈয়দের কাছ থেকে। এদিকে কাজিরগাঁও ময়দা মিলের কাছে একটি ও গির্জাপাড়া আবাসিক এলাকায় একটি প্লট এবং দরগাহ মহল্লা এলাকায় আরও একটি জমি কিনেছেন গত ৫ বছরে। ঢাকার বনানীতে ২টি ফ্লাট বাড়ি কিনেছেন বলে জানা গেছে। গত মাসে যৌথ বাহিনী তাকে শহরের পশ্চিমবাজারের ঢাকা ব্যাংক থেকে আটকের সময় তার একাউন্টে কোটি টাকা ছিল বলে জানা গেছে।
নোমান আতংক : জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক যুবদল নেতা নুরুল আলম নোমান মৌলভীবাজার ঠিকাদার সমিতির স্বঘোষিত সাধারণ সম্পাদক ও নাসের রহমানের নাম ভাঙানোর কারণে অপরাপর ঠিকাদারা তার ভয়ে তটস্থ থাকতেন। নোমান সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ ঠিকাদাররা দরপত্র কিনতে পারেননি। নোমান কারও বিরুদ্ধে নাসের রহমানের কাছে অভিযোগ দিলেই তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন নাসের রহমান। ক্ষেত্রবিশেষ দল থেকে বহিষ্কারের মতো সিদ্ধান- নেয়া হতো।
ছিনতাইকারীদের গডফাদার : মৌলভীবাজার জেলা প্রবাসী অধু্যষিত হওয়ায় এখানে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের বড় বাজার রয়েছে। সুবিধাভোগী বিভিন্ন ব্যাংক ম্যানেজার ও প্রভাবশালী ব্যক্তি এই হুন্ডি ব্যবসার মদদদাতা থাকলেও জোট সরকারের আমলে ৫ বছর এক অসাধু পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে সিন্ডিকেট করে নোমান বাহিনী হুন্ডির লাখ লাখ টাকা লুট করে নেয়। ২০০৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে সদর থানা থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে পূবালী ব্যাংকের ভল্ট ভেঙে ৪৫ লাখ ৭২ হাজার ৬২৯ টাকা ৫৭ পয়সা ডাকাতি হয়। পরে অভিযোগ ওঠে, নোমান সিন্ডিকেট ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ঘটায়। কিন\’ তখন তাদের বিরুদ্ধে কার্যকরী কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি রহস্যজনক কারণে।
সূত্রঃ http://jugantor.com/online/news.php?id=51499&sys=1

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

%d bloggers like this: